বৈশাখ গেছে ভেসে, ঈদ নিয়েও শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা

0
313

বিশ্বজুড়ে বৈশাখী ঝড়ের মতো আসা নভেল করোনাভাইরাস মহামারীতে এবার পণ্ড হয়ে গেছে বাংলা নববর্ষ; এখন ঈদ নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন দেশের অন্য স্থানের মতোই চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা।

প্রতিবার রোজা শুরুর আগে থেকে চট্টগ্রামের পোশাকের বাজারে ক্রেতাদের চাপ সৃষ্টি হয়। বিক্রেতাদেরও এই সময়ে ব্যস্ততা যায় নতুন পোশাকের পসরা সাজাতে।

কিন্তু এবারের ঈদের বাজারের শুরুটায় ভিন্ন চিত্র। বড় লোকসানের আশঙ্কায় আশঙ্কিত ব্যবসায়ীরা বলছেন, এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন তারা আগে কখনও হননি।

বিশ্বজুড়ে লাখো মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ানো করোনাভাইরাসের দেশে বিস্তার ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে লকডাউনে দেশ। আপাতত আগামী ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত দেশ এমন অবরুদ্ধ থাকবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এই সময়ে সব গণপরিবহন থাকছে বন্ধ, নিত্য পণ্যের দোকান ছাড়া অন্য সব দোকানও বন্ধ; মানুষকে থাকতে হবে ঘরে, জরুরি প্রয়োজনে বের হলেও তা সীমাবদ্ধ সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে।

ব্যবসায়ীরা বলেন, বাংলাদেশের মানুষের পোশাক কেনাকাটা মূলত উৎসবকেন্দ্রিক। এজন্য পহেলা বৈশাখে অনেক বিক্রি হয়। এবার বৈশাখের জন্য প্রস্তুতি ছিল তাদের, কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে তাদের লোকসান গুণে হচ্ছে। এখন লকডাউন যদি আরও বাড়ে, তবে ঈদের আগে ক্ষতি সামলে উঠা দুরূহ হয়ে যাবে।

চট্টগ্রামের কাপড়ের বৃহত্তম পাইকারি বাজার টেরিবাজার। এই টেরিবাজার থেকে চট্টগ্রামের পাশাপাশি তিন পার্বত্য জেলা, কক্সবাজার ও ফেনীর কিছু কিছু স্থানে মালামাল যায়।

টেরিবাজারে ছোটবড় মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার দোকান আছে। সারা বছর বিকিকিনি হলেও ঈদকে কেন্দ্র করেই মূলত ব্যবসা হয়ে থাকে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

টেরিবাজারের বিভিন্ন ধরনের পোশাকের বড় শো-রুমের একটি রাজপরী। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার হুমায়ুন কবির মানিক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান করোনাভাইরাসের থাবায় তাদের বিপুল ক্ষতির কথা।

তিনি বলেন, “টেরিবাজারের ব্যবসা মূলত হয় রোজা ও তার আগের এক মাসে। এই দুই মাসেই আমাদের সারা বছরের আয় রোজগার উঠে আসে। যেটি এবার আমাদের পুষিয়ে উঠতে অনেক কষ্ট হবে।”

তিনি জানান, গত ১৫ মার্চ বন্ধ শুরু হওয়ার আগেই তারা অনেকেই দোকানে মালামাল তুলেছেন। আবার বাইরেও মালামাল বুকিং করে রেখেছেন। আর তাদের সাথে অনেকের ব্যবসায় হয় মালামাল বিক্রি করে টাকা পরিশোধের হিসেব করে।

“গত বছর আমাদের কাছ থেকে অনেকে মালামাল নিয়েছেন। তারা এবার সে টাকা পরিশোধ করবেন। কিন্তু এবার আমাদের মতো করে তারা ও ব্যবসা বন্ধ রেখেছেন। যাতে করে টাকা পাওয়া আমাদের জন্য কষ্টকর হয়ে যাবে। সবার তো একই অবস্থা। টাকার জন্য কাউকে চাপও দেওয়া তো যাবে না। এটা আমাদের জন্য চরম ক্ষতি।”

মানিকের দাবি, প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখলেও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করতে হচ্ছে। প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা কর্মচারীদের বেতন দিতে হয়। অন্যান্য খরচও এর সঙ্গে যুক্ত আছে।

চট্টগ্রামের টেরিবাজারে শাড়ি, রেডিমেইড থ্রি-পিস, শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবির মতো সব ধরনের পোশাকের পাশাপাশি সেগুলোর কাপড় বিক্রি হয়ে থাকে।

ক্রেতারা রোজার আগে থেকেই ভিড় জমান টেরিবাজারে। পছন্দের কাপড় কিনে নিজেদের মতো ডিজাইন দিয়ে সেলাই করে নেন। যার কারণে ঈদের আগেই জমে উঠে টেরিবাজারের বিকিকিনি।

টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মান্নান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, প্রতিবছর ঈদের দুই মাস আগে থেকেই টেরিবাজারে বেচাকেনা শুরু হয়। সেজন্য ব্যবসায়ীরা কয়েক মাস আগে থেকে দেশের ও দেশের বাইরে থেকে মালামাল সংগ্রহ করে ফেলেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

কিন্তু এবছর সারা দেশের মতো চট্টগ্রামেরও দোকান বন্ধ থাকায় ঈদের বাজারে ক্ষতির শঙ্কা দেখছে এ ব্যবসায়ী নেতা।

প্রতি বছর শুধু ঈদে টেরিবাজারে হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয় দাবি করে মান্নান বলেন, “প্রতিবারের মতো এবারও ব্যবসায়ীরা ব্যাংক কিংবা বিভিন্ন ভাবে ঋণ নিয়ে মালামাল দোকানে তুলে ফেলেছেন। এক মাসের বন্ধ থাকায় আমরা দিশেহারা।”

ব্যবসায়ী নেতা মান্নান আরও বলেন, টেরিবাজারের এক একটা শোরুমে ৫০ থেকে ১০০ জন কিংবা তার বেশি কর্মচারি রয়েছে। তাদের বেতন দিতে মাসে খরচ হয় পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা। কিন্তু এক মাসের বন্ধে এক টাকাও আয় করতে পারেনি ব্যবসায়ীরা।

ঈদের পাশাপাশি পহেলা বৈশাখেও টেরিবাজারে ভালো একটা বেচাকেনা হয়। কিন্তু এবছর সেটাও হয়নি। নববর্ষকেন্দ্রিক পোশাকগুলো পড়ে থাকবে দোকানে।

মান্নান বলেন, ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত সরকার বন্ধ ঘোষণা করেছে। সামনে কী পরিস্থিতি হয় সেটা এখনও কেউ জানে না। এই অবস্থায় ব্যবসায়ীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

তিনি বলেন, “সরকার বিভিন্ন সেক্টরে প্রণোদনা দিচ্ছে। আমরা পাব কি না, জানি না। আমরা চাই, আমাদেরও কিছু প্রণোদনা দেওয়া হোক। ব্যবসা না হলেও ব্যাংক সুদ, ট্যাক্স আমাদের দিতে হবে। আমরা সেগুলো মওকুফের পাশাপাশি সরকারি প্রণোদনাও চাই।”

চট্টগ্রামের বেশি বেচাকেনা হওয়া আরেকটি মার্কেট পৌর জহুর হকার্স মার্কেট। ধনী-গরিব সব শ্রেণির মানুষের সাধ ও সাধ্যের মধ্যে বাজার করতে পারেন এই মার্কেটে।

এই মার্কেটটিতে আছে অন্তত সাড়ে নয়শ দোকান। টেরিবাজারের ব্যবসায়ীদের মতো তারাও বলেছেন, করোনাভাইরাসের প্রভাবে যে ক্ষতি ব্যবসায় হচ্ছে তা পুষিয়ে নিতে তাদের অনেক বেগ পেতে হবে।

পৌর জহুর হকার্স মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির কার্যনির্বাহী সদস্য ও আরাফাত গার্মেন্টেসের মালিক মো. ওসমান গণি জানান, ঈদের জন্য তাদের অনেকে দোকানে মাল তুলেছেন। আবার অনেকের মাল উঠার অপেক্ষায়। কিন্তু ব্যবসা বন্ধ থাকায় তারা শঙ্কায় আছেন।

তিনি বলেন, “দোকানিরা কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করলেও সেগুলো আটকে গেছে। ব্যবসা বন্ধ থাকার কারণে। আবার দোকানের কর্মচারীদের বেতনও দিতে হবে। সবমিলিয়ে আমাদের এখন পথে বসার অবস্থায়।”

চট্টগ্রামে অন্যতম একটি বাজার তামাকমুন্ডি লেইন ও রেয়াজউদ্দিন বাজার। পোশাক, কসমেটিকস, ইলেকট্রনিক্স, ক্রোকারিজসহ নানা ধরনের দোকান এই মার্কেটে। সারা বছর ক্রেতা সমাগম থাকা এই মার্কেটটি পোশাকসহ চট্টগ্রামবাসীর জন্য সব ধরনের জিনিসের চাহিদা মেটায়। 

তামাকমুন্ডি লেইন বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আহমেদ কবির দুলালের ধারণা এ বছর ঈদের বাজারে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের প্রভাবে তাদের ব্যবসা কম হবে অন্যান্য বছরের চেয়ে ৫০ থেকে ৬০ ভাগ। যেটি ব্যবসায়ীদের চরম ক্ষতি।

তিনি বলেন, সারা বছর তামাকমুন্ডি লেইনে ব্যবসা হলেও ঈদের সময় তা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। তবে এবারের ঈদ বাজারে ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির শিকার হবেন।

তিনি জানান, এবার বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারীতে চীনসহ কয়েকটি দেশ থেকে আমদানি বন্ধ থাকায় অনেক ব্যবসায়ীর মাল আটকে গেছে। যার কারণে ঈদের জন্য অন্যবার যে ধরনের প্রস্তুতি ব্যবসায়ীরা নিতেন, তাও নিতে পারেননি।

দুলাল বলেন, ক্রেতা-বিক্রেতাদের অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে এবছর তাদের বিক্রিও অন্যান্যবারের চেয়ে অন্তত ৬০ শতাংশ কম হতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here