আবদুল মোনেম: শূন্য থেকে সফল এক নির্মাণ ব্যবসায়ীর জীবনালেখ্য

0
475

কৈশোরোত্তীর্ণ এক তরুণ যখন এসএসসি পাসের সনদ নিয়ে গ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন তখন তার এই শহরে টিকে থাকায়ই ছিল সংগ্রামের, লেখাপড়ার পাশাপাশি নির্মাণ ব্যবসা শুরু করা সেই ছেলেটিই হয়ে উঠেছিলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী।

৮৬ বছর বয়সে রোববার যখন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন ব্যবসায়ী গোষ্ঠী মোনেম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল মোনেম, তখন তার ব্যবসার সাম্রাজ্য বিশাল। নিজের নামে গড়ে তোলা এই প্রতিষ্ঠানের ছাতার নিচে রয়েছে ডজনের বেশি কোম্পানি।

আবদুল মোনেম লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা মোনেম বাংলাদেশের নির্মাণ শিল্পের পথিকৃৎ। মোনেমকে ‘আপাদমস্তক একজন সফল ব্যবসায়ী’ অভিহিত করে একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “তিনি কোনো রাজনীতি বা রাজনৈতিক দর্শনের সমর্থক ছিলেন না। সব সময় একটা কথা বলতেন, কীভাবে মানুষের কর্মসংস্থান করা যায়।”

প্রকৌশলী আব্দুল মোনেমের জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। পঞ্চাশের দশকের শুরুর দিকে এসএসসি পাস করে মোনেম যখন ঢাকায় আসেন, তখন তার হাতে ছিল গুটিকয়েক টাকা যা দিয়ে চলাই ছিল দায়।

অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ঠিকাদার হিসেবে কাজ শুরু করা মোনেম পরে ১৯৫৬ সালে মাত্র ২০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম লিমিটেড গড়ে তোলেন।

তিনি এই কোম্পানিকে বাংলাদেশের অবকাঠামো নির্মাণ শিল্পের সামনের কাতারে নিয়ে আসেন। তার নিজের নামে গড়া এএমএল কন্সট্রাকশনস লিমিটেড হয়ে ওঠে দেশের অন্যতম শীর্ষ কন্সট্রাকশনস ফার্ম।

৬০ বছরের বেশি সময় কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘মার্কেট লিডার’ হিসেবে বিবেচিত এএমএল কন্সট্রাকশসের দেশের সবচেয়ে বড় ও চ্যালেঞ্জিং ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে ভূমিকা রয়েছে। সড়ক, সেতু, ফ্লাইওভারসহ দেশের বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ কাজে যুক্ত এএমএল কন্সট্রাকশনস মেট্রো রেল প্রকল্প এবং পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পেও বিভিন্ন কাজে জড়িত। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সিলেটের ওসমানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে নির্মাণেও ভূমিকা রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের।

শুধু ব্যবসায়ী নন, একজন ভালো মানুষ হিসেবেও আবদুল মোনেমের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম।

স্মৃতিচারণ করে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উনি শুধু বয়সের কারণে মুরুব্বি ছিলেন না, সত্যিকার অর্থেই মুরুব্বি ছিলেন। তিনি ছিলেন আমাদের অবিভাবক। একজন বড় মাপের মানুষ ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে একজন সুমানুষ ছিলেন।”

ফজলে ফাহিম বলেন, “২০০২ সালে পড়াশোনা শেষ করে আমি আমেরিকা থেকে দেশে ফিরি। উনার সঙ্গে আমার দেখা হয় ২০০৩ সালে। আমাদের পরিবারের সঙ্গেও উনার একটা ভালো সম্পর্ক ছিল।”

আবদুল মোনেম তার মনে ভিন্নভাবে স্থান করে নিয়েছিলেন জানিয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, “আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে একটি হাইওয়ে রাস্তা করেছিলেন তিনি। নিজের নামে গড়া এএমএল কন্সট্রাকশনস করেছিল ওই রাস্তাটি। রাস্তাটি খুবই সুন্দর হয়েছিল। সবাই বলত, মোনেম সাহেব রাস্তাটি করেছেন, সে কারণেই এতো ভালো-সুন্দর। ওই সময় থেকেই তিনি আমার মণিকোঠায় ভিন্নভাবে স্থান করে নিয়ে আছেন।

“বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে তার অবদান বলে শেষ করা যাবে না। অনেক কষ্ট করে, ধাপে-ধাপে তিনি তার প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলেছিলেন।”

আবদুল মোনেম ব্যবসা সম্প্রসারিত করেছিলেন অনেক ক্ষেত্রে; খাবার, বেভারেজ, ফার্মাসিউটিক্যালসসহ আরও নানা খাতে বিনিয়োগ করেছিলেন তিনি। ১০ হাজারের বেশি মানুষ তার কোম্পানিগুলোতে নিয়োজিত রয়েছে। 

মোনেম গ্রুপের অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে, ইগলু আইসক্রিম, ম্যাংগো পাল্প প্রোসেসিং, ইগলু ফুডস, ড্যানিস বাংলা ইমালসন, ইগলু ডেইরি প্রোডাক্টস, সুগার রিফাইনারি, এম এনার্জি লিমিটেড, নোভাস ফার্মাসিউটিক্যালস, এএম আসফল্ট এ্যান্ড রেডিমিক্স লিমিটেড, এএম অটো ব্রিকস, এএম ব্র্যান অয়েল কোম্পানি, সিকিউরিটিজ ও ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড এবং এএম বেভারেজ।

এ গ্রুপের মালিকানাধীন আবদুল মোনেম অর্থনৈতিক অঞ্চল যাত্রা শুরু করে ২০১৫ সালে। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়াতে দেশের দ্বিতীয় বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলেন তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here