করোনাভাইরাস মহামারীর ‘দ্বিতীয় পর্যায়’: এশিয়া থেকে শিক্ষা

0
345

মহামারীর বিস্তার, লকডাউন ঘোষণা এবং অবস্থার উন্নতি হলে তা উঠিয়ে নেওয়া – করোনাভাইরাস নিয়ে এই অভিজ্ঞতাগুলো এশিয়াতেই প্রথম পাওয়া গেছে। এশিয়াতেই আবার নতুন করে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় পর্যায় দেখা যাচ্ছে – সিউলের নাইট ক্লাবগুলোতে, রাশিয়া-চীন সীমান্তসহ আরও কিছু জায়গায়। এখনও অবশ্য এ থেকে কোনো উপসংহারে পৌঁছানো যায় না, তবে কিছু শিক্ষা নেওয়া যায় কি?

‘সেকেন্ড ওয়েভ’ বা করোনাভাইরাস মহামারীর দ্বিতীয় পর্যায়, ‘স্পাইক’ বা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া এবং ‘ক্লাস্টার’ অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় অনেক বেশি সংক্রমণ – কথাগুলো এখন ঘুরেফিরে আসছে।

চিকিৎসাশাস্ত্রের ভাষায় ‘সেকেন্ড ওয়েভ’ বলতে মহামারী একবার কমে যাওয়ার পর আবার নতুন করে ছড়ানোটাকে বোঝায়। অতীতে মহামারীগুলোর ক্ষেত্রে এমনটা দেখা গিয়েছিল।

এশিয়াতে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন এলাকায় যেমন আবার করোনাভাইরাস ফিরে এসেছে। আবার কোথাও পুরো অঞ্চলে হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ঘটনাও আছে। তবে সেগুলো দ্বিতীয় পর্যায়ের মহামারী কিনা সেটা অনুমান করা কঠিন।

তবে লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজের জীববিজ্ঞানী জেনিফার রনের কাছে করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় পর্যায় আসবে কিনা সেটা নিয়ে আর সংশয় নেই। তার কাছে কখন আসবে আর তা কেমন ধ্বংসাত্মক হবে সেটাই দেখার বিষয়।

এমনকি দক্ষিণ কোরিয়ার মতো পরীক্ষা, কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং এবং লকডাউন ব্যবস্থাপনায় সফল দেশগুলোতেও হঠাৎ করে প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়া এবং নির্দিষ্ট এলাকায় অনেক বেশি সংক্রমণের ঘটনা দেখা গেছে।

সুতরাং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যখন বলছে, ভাইরাসটি হয়তো টিকে থাকার জন্যই এসেছে, তখন দেশগুলোকেও বুঝতে হবে, তাদের নতুন সংক্রমণের মুখোমুখি হতে হবে। এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হলো, কীভাবে তা আগেই অনুমান, চিহ্নিত ও মোকাবিলা করা যায়।

খুব আশাবাদী হবেন না”, সতর্ক করে দিয়েছেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের স্বাস্থ্যনীতি বিভাগের স্বাস্থ্য অর্থনীতির চেয়ার অধ্যাপক অ্যালিস্টার ম্যাকগুইয়ার।

“একটি সফল লকডাউনের অর্থ এই নয় যে কোনও অঞ্চল করোনাভাইরাস মুক্ত থাকবে।”

জাপানের হোক্কাইডো অঞ্চলে ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে কঠোর লকডাউন ছিল। মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা দিনে এক-দুটিতে কমে এসেছিল। ব্যবস্থাগুলো এত ভাল কাজ করেছিল যে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হয়েছিল এবং এপ্রিলের মধ্যে স্কুলগুলো আবার চালু হয়েছিল। তবে এক মাস পার হওয়ার আগেই আবার জরুরি অবস্থা জারি করতে হয়েছিল। কারণ দ্বীপটিতে হঠাৎ সংক্রমণের দ্বিতীয় ধাপ দেখা দেয়।

দ্বিতীয় পর্যায়ের এই লকডাউন এখন আবার উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ জানে, এটি আবারও হতে পারে – যতক্ষণ পর্যন্ত না কোনও টিকা আসবে।

চীনেও নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কমে যাওয়ার সাথে সাথে বিধিনিষেধ উঠিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে উহানসহ কয়েকটি অঞ্চলে ভাইরাসের নতুন ‘ক্লাস্টার’ দেখা দেয়।

চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জিলিন প্রদেশের শুলানে কয়েক ডজন নতুন আক্রান্তের ঘটনায় সেখানে আবার কঠোর লকডাউন ফিরে আসে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় সিউলের বাইরের একটি লজিস্টিক সেন্টারে সর্বশেষ ক্লাস্টারের কারণে ২০০টি স্কুল মাত্র কয়েক দিন খোলা রাখার পর আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বিদেশ থেকে আগতদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা

চীনের জিলিন এবং হেইলংজিয়াং প্রদেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার জন্য প্রতিবেশী রাশিয়া আসা চীনাদের চিহ্নিত করা হয়েছে।

এক পরীক্ষায় রাশিয়া থেকে আসা আটজন চীনা নাগরিকের মধ্যে করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ওই সময়ে রাশিয়া ভ্রমণ করা ৩০০ জন চীনাকে কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়।

চীনে অনেক সময়ই দেখা যাচ্ছিল, বিদেশ থেকে আসা সংক্রমণের সংখ্যা স্থানীয় সংক্রমণকে ছাড়িয়ে গেছে। এটি মোকাবিলায় কঠোর কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা ফিরে এসেছে। যেমন বেইজিংগামী সব আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পাশের বিভিন্ন শহরে পাঠিয়ে যেখানে যাত্রীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কোয়ারেন্টাইন করা হচ্ছে।

বিদেশ থেকে ফেরাদের গতিবিধি দেখতে ও তাদের কোয়ারেন্টাইন মেনে চলাটা নিশ্চিত করতে হংকং ইলেক্ট্রনিক ব্রেসলেট ব্যবহারের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার করছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের পদক্ষেপগুলি গুরুত্বপূর্ণ।

পরীক্ষা এবং কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং থামানো যাবে না

ফেব্রুয়ারির গোঁড়ার দিকেই দক্ষিণ কোরিয়া প্রতিদিন ১০ হাজার পরীক্ষা বিনামূল্যে চালানোর ব্যবস্থা করেছিল। একই সঙ্গে অ্যাপস এবং জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে আক্রান্তদের খুঁজে করার চেষ্টা চলছিল। ফলে নতুন প্রাদুর্ভাব দ্রুত নির্মূল করার কাঠামো তারা গড়ে তুলতে পেরেছিল।

এতে স্থানীয়ভাবে একটা সতর্কতা ব্যবস্থা চালু হয়ে যায়। তাই সাধারণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার সময় যদি নতুন কোথাও প্রার্দুভাব দেখা দেয় তবে নির্দিষ্ট সেই এলাকা লকডাউন করা সম্ভব হবে।

এ ব্যবস্থা কাজেও দিয়েছে। কয়েক সপ্তাহ নতুন কোনো অভ্যন্তরীণ সংক্রমণ না পাওয়ার পর ১২ মে নতুন একটি ক্লাস্টারের খোঁজ পাওয়া যায়। দ্রুত বের করা যায় যে সিউলের জনপ্রিয় নাইটক্লাব এলাকার কিছু জায়গার সঙ্গে একটি সম্পর্কিত। কর্তৃপক্ষ এখন এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ৯০ হাজার মানুষকে চিহ্নিত করেছে।

ক্লাবগুলোর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত প্রায় ৩০০ আক্রান্তকে পাওয়া গেছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ও কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংয়ের কাঠামো থাকাতেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গেছে।

নির্দিষ্ট কোনো সমাধান নেই

করোনাভাইরাসের মহামারী নিয়ে ড. রন বলেন, “ভাইরাস নতুন হলে আর মানুষের মধ্যে এর কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকলে লকডাউন তুললে সংক্রমণ ফিরে আসবে।”

পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ডব্লিউএইচও-এর কোভিড-১৯ বিষয়ক কর্মকর্তা ড. নাওকো ইশিকাওয়ার কাছে সম্ভবত সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি হলো, “এমন কোনও একক ব্যবস্থা বা কৌশল নেই যা পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।”

“কেবল পরীক্ষা করে অথবা কেবল শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার বিধিনিষেধ আরোপ করে হবে না।”

ড. রন বলেন, “জনগণের মধ্যে রোগ প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থা নেই। কার্যকর এবং সবার হাতে পৌঁছানোর মতো টিকা না পাওয়া পর্যন্ত আমরা সবাই ঝুঁকিতেই আছি।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here