চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা সাধারণ যাত্রীদের কাছে দুঃসহ হয়ে উঠেছে

0
44

গত কয়েকবছর ধরে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা সাধারণ যাত্রীদের কাছে দুঃসহ হয়ে উঠেছে। সরকার ও প্রশাসন এ অপরাধ বন্ধ করতে নানা সময় নানা কার্যক্রম হাতে নেয়।কিন্তু অপরাধীদের দমন সম্ভব হয়নি। যে কারণে বিভিন্ন সময় এমন ঘটনা ঘটে। যাত্রীরা আহত হন; অনেক সময় লুট হয় তাদের প্রয়োজনীয় বস্তু।

কিছুদিন হলো ঢাকার মধ্য দক্ষিণের জেলা ফরিদপুরে আবারও শুরু হয়েছে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ। এমন ঘটনা ঘটিয়ে অপরাধীদের সুখ কী, তা জানা যায়নি এখনও। বেশ কয়েদিন বন্ধ থাকলেও ফের শুরু হয়েছে এ অপরাধ। আহত হয়েছেন কয়েকজন যাত্রী।

বেশিরভাগ সময় রাতের দিকে ট্রেনে পাথর ছোড়া হয়। বড় কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলেও যেকোনো সময় আশঙ্কাজনক কিছু ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। ফরিদপুরে হয়ে চলাচলকারী ট্রেনের যাত্রীরা তাই আতঙ্কগ্রস্ত।

জানা গেছে, শুক্রবার (১৪ অক্টোবর) রাতে ফরিদপুর থেকে ভাঙ্গা যাওয়ার পথে পুখুরিয়া স্টেশন থামে একটি ট্রেন। স্টেশন থেকে ছাড়ার অল্প সময় পর ট্রেনে পাথর ছোড়ে কে বা কারা। এ সময় গুরুতর আহত হন লুবনা বেগম (২০) নামে এক যাত্রী।

আবু বকর সিদ্দিকী নামে এক রেলযাত্রী জানিয়েছেন, ভাঙ্গা স্টেশন থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনটি তালমা স্টেশন ছাড়ার পরপরই পাথরের আঘাতে আরেক যাত্রী আহত হন। তার কপাল ফেটে গেছে।

অনেক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, পাথর ছোড়ার ঘটনার শিকার অনেকেই থানা কিংবা রেল পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। কিন্তু তারা এসব অভিযোগ নিয়ে কোনো বিকার দেখান না। তাদের ভাষ্য, অপরাধীরা চিহ্নিত হয় না। তাই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া যায় না।

ভাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি সাংবাদিক আব্দুল মান্নান মুন্নু বাংলানিউজকে জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময় ফরিদুপর-ভাঙ্গা হয়ে যেসব ট্রেন যায়, অধিকাংশই পাথরকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এ রুটের অন্তত ১০ যাত্রী পাথরের আঘাতে আহত হয়েছেন।

২০২১ সালে চলন্ত ট্রেনে পাথর ছোড়ার ঘটনায় জেলা প্রশাসন ও রেল কর্তৃপক্ষের নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীও অভিযান চালায় চালায়। কিন্তু কিছুতেই কোনো সমাধান আসেনি। পরে স্থানীয় সরকার ও জনপ্রতিনিধি এ অপরাধ নির্মূলে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালায়। রেলওয়ে পুলিশ পাথর নিক্ষেপকারীদের ধরিয়ে দিলে বা তথ্য সরবরাহ করলে নগদ টাকা পুরস্কারেরও ঘোষণা করে। ফলে কিছুদিনের জন্য ট্রেনে পাথর ছোড়ার মতো অপরাধ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু গত মাস থেকে আবার এ অপরাধ শুরু হয়েছে।

স্থানীয় অনেকেই অভিযোগ করেন, অপরাধীরা রেল লাইনের স্লিপারে রাখা পাথর নিয়ে ট্রেনে ছোড়ে। এতে কয়েক ধরনের সমস্যা হয়। অনেক সময় স্লিপার বা লাইনের কাঠের তক্তা সরে যায়; যে কারণে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটনার সম্ভাবনা রয়েছে। যাত্রীরা তো আহত হনই, মৃত্যুর শিকারও হতে পারেন তারা। এ ছাড়া, এমন নজির আছেও। ট্রেন লুটের মতো ঘটনাও ঘটে থাকতে পারে।

আগের মতো প্রচারণা এখনও চলছে। কিন্তু কোনোভাবেই এ অপরাধ বন্ধ করা যাচ্ছে না। যাত্রীরা মনে করেন, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, রেল পুলিশ ও থানা পুলিশের সদিচ্ছার অভাবের কারণে এমন গুরুতর অপরাধ বন্ধ হচ্ছে না।

ফরিদপুরের ভাঙ্গা রেলস্টেশন মাস্টার মো. শাহজাহান বাংলানিউজকে বলেন, সম্প্রতি পাথর ছোড়ার ঘটনার কয়েকটি অভিযোগ আমরা পেয়েছি। ফরিদপুরের পুখুরিয়া থেকে তালমার মাঝামাঝি জানদি গ্রাম ছাড়িয়ে এ ঘটনা বেশি ঘটছে। পুখুরিয়া পেরোনোর পর ও বাখুন্ডার কাছাকাছি এলাকায় পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটছে। বেশিরভাগ সময় সন্ধ্যা বা রাতের দিকে এ ঘটনা বেশি ঘটছে।

এ রেল মাস্টারের অভিযোগ, পাথরকাণ্ডের শিকার ভুক্তভোগীরা সচরাচর লিখিত অভিযোগ দেন না। তাই নির্দিষ্ট করা যাচ্ছে না ঠিক কতবার এ ঘটনা ঘটে। প্রকৃত হিসাবও রাখা যাচ্ছে না। সিআরপি থেকে সংবাদ সম্মেলন করে এসব ঘটনার বিরুদ্ধে জনমত তৈরির অনুরোধ জানানো হয়েছে।

রেলওয়ের প্রচারণা
ট্রেনে পাথর ছোড়ার মতো অপরাধ করা ব্যক্তিদের তথ্য দিতে পারলে বা ধরিয়ে দিলে নগদ ১০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে রেলওয়ে পুলিশ। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষও বিভিন্নভাবে প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছে। রেলওয়ে আইনের ১২৭ ধারা অনুযায়ী ট্রেনে পাথর নিক্ষেপকারীদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করার বিধান আছে। ৩০২ ধারা অনুযায়ী পাথর নিক্ষেপে কারও মৃত্যু হলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে। কিন্তু বাস্তবে তা আদৌ হয়েছে কিনা, তা জানা যায়নি।

রাজবাড়ী রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুদ আলম বলেন, পাথর ছোড়ার ঘটনায় ভুক্তভোগীরা যদি সঠিক সময়ে অভিযোগ জানান, তাহলে পুলিশের কাজ করতে সুবিধা হয়। আমরা মাঝেমধ্যে রেলে ডিউটিরত পুলিশের মাধ্যমে খবর পেলে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিই। এর আগে ফরিদপুরের ডিবি পুলিশকে দিয়ে অভিযান চালানোর পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। নতুন যে দুটি ঘটনা ঘটেছে, তদন্ত করতে আমরা আগামী সোমবার ঘটনাস্থলে যাব। স্থানীয় মেম্বার ও চেয়ারম্যানদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) মোহাম্মদ ইমদাদ হোসাইন বলেন, এ রকম ঘটনা এখন পর্যন্ত রেল কর্তৃপক্ষ আমাদের জানায়নি। যদি রেল কর্তৃপক্ষ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সহকারে পুলিশের সহযোগিতা চায়, এসব ঘটনায় আইনি সহায়তা করা হবে।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, রেলযাত্রা নিরাপদ করতে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আমরা নেব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here